ত্রিত্ববাদ বা ট্রিনিটি মানে কি?

YouTube player

অনেক সময় মানুষ “ট্রিনিটি” বা ত্রিত্ববাদ শব্দটি শোনার পর আমাদের জিজ্ঞাসা করে যে, ট্রিনিটি মানে কি? এই আর্টিকেলে আমরা ট্রিনিটি বা ত্রিত্ববাদ কি তার একটি সহজ ব্যাখ্যা দিতে চাই। তবে এখানে আমরা বলে রাখতে চাই যে, যদিও কোনদিনও আমরা সৃষ্টিকর্তাকে সম্পূর্ণ ও পরিপূর্ণভাবে বুঝতে পারব না, তবুও তিনি আমাদের যতটুকু বুঝতে দিয়েছেন, ততটুকু অবশ্যই আমাদের পক্ষে বোঝা সম্ভব এবং উচিত।

এখানে প্রথমে আমাদের বুঝতে হবে যে, ট্রিনিটির অর্থ তিনজন ঈশ্বরে বিশ্বাস নয়।  ঈসা মসীহের অনুসারীরা  একেশ্বরবাদী, অর্থাৎ আমরা শুধুমাত্র এক মাবুদ আল্লাহে বিশ্বাস করি। আসুন বিষয়টি বুঝতে একটি উদাহরন দেখি।

প্রতিটি ব্যক্তি যদিও একজন মানুষ, তবুও প্রতিটি মানুষ খুবই জটিল। আমাদের প্রত্যেকেরই একটি দেহ আছে, একটি রুহু বা আত্মা আছে, এবং আমাদের একটি প্রাণ আছে।

যদি মানুষের ক্ষেত্রে এমন হয় তবে মাবুদ আল্লাহ্‌ নিশ্চয় আরও জটিল সত্তা। পাক কিতাব আমাদের বলে যে, মাবুদ  আল্লাহ্‌ এক, কিন্তু তাঁর একটি রুহু আছে। এখানে দুটি প্রশ্ন আপনাকে করতে চাই। প্রথমত, মাবুদ আল্লাহ্‌র আত্মা বা রুহু কি ঐশ্বরিক নাকি মানবিক? অবশ্যই ঐশ্বরিক।

দ্বিতীয়ত, মাবুদ আল্লাহ্‌র আত্মা কি সৃষ্ট নাকি অসৃষ্ট? অবশ্যই মাবুদ আল্লাহর আত্মা সৃষ্ট নয়, কারণ তিনি কখনই অনুপস্থিত ছিলেন না এবং তাঁকে কেউ সৃষ্টি করতে পারে না।

এ থেকে আমরা বুঝতে পারি যে মাবুদ আল্লাহ্‌, আমাদের সৃষ্টিকর্তা অনন্তকাল থেকে তাঁর ঐশ্বরিক  রুহুর সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে সহাবস্থান করেছিলেন। পাক কিতাবে মাবুদ আল্লাহ্‌র রুহুকে পাক-রুহু বা পবিত্র আত্মা বলা হয়।

এবার আসুন মাবুদ আল্লাহ্‌র আরেকটি দিক দেখি। মাবুদ আল্লাহ্‌র একটি কথা বা কালাম আছে। আপনি কি তাঁর এই কালামকে ঐশ্বরিক না-কি মানবিক মনে করেন? অবশ্যই এটাও ঐশ্বরিক। পাক কিতাবও আমাদের সেই কথাই বলে।

এবার বলুন তো, মাবুদ আল্লাহ্‌র কালাম কি সৃষ্ট বা সৃষ্টিহীন? অবশ্যই মাবুদের কালাম সৃষ্টিহীন কারণ তাঁর কালাম সর্বদাই তাঁর সঙ্গে ছিলেন।

এখান থেকে আমরা বুঝতে পারি যে মাবুদ আল্লাহ্‌, যিনি সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা, তিনি অনন্তকাল থেকে তাঁর ঐশ্বরিক কালামের সাথে সহাবস্থান করেছেন। পাক কিতাব মাবুদ আল্লাহ্‌র এই কালামকে ঈসা মসীহ্‌ বলে আমাদের কাছে প্রকাশ করেছে।

আর এটিই ত্রিত্ব-বাদের বা ট্রিনিটির অর্থ। এটা সেই বিশ্বাস যেখানে সৃষ্টিকর্তা মাবুদ আল্লাহ্‌, যদিও তিনি এক সত্তা তবে তিনি অনন্তকাল থেকে তাঁর ঐশ্বরিক রুহু এবং তাঁর ঐশ্বরিক কালামের সাথে সহাবস্থান করছেন।

ইঞ্জিল শরীফে অনেকগুলো অনুচ্ছেদ আছে, যেখানে এই সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আমরা হয়ত অনান্য আর্টিকেলে সেগুলি সম্পর্কে আলোচনা করব। তবে আসুন এখন শুধুমাত্র একটি অনুচ্ছেদ দেখি:

ঈসা মসীহ তাঁর অনুসারীদের বলেছিলেন: “বেহেশতের ও দুনিয়ার সমস্ত ক্ষমতা আমাকে দেওয়া হয়েছে। এইজন্য তোমরা গিয়ে সমস্ত জাতির লোকদের আমার উম্মত কর। পিতা, পুত্র ও পাক-রূহের নামে তাদের তরিকাবন্দী দাও। আমি তোমাদের যে সব হুকুম দিয়েছি তা পালন করতে তাদের শিক্ষা দাও। দেখ, যুগের শেষ পর্যন্ত সব সময় আমি তোমাদের সংগে সংগে আছি।” (মথি ২৮ঃ১৮-২০)

এখানে ঈসা মসীহ, পিতা সম্পর্কে কথা বলেছেন – যা আমাদের কাছে সৃষ্টিকর্তা পিতা আল্লাহ্‌কে নির্দেশ করে। ঈসা মসীহ নিজেকে পুত্র বলে মাবুদ আল্লাহর পুত্র হিসাবে উল্লেখ করেছেন, এটি হল আধ্যাত্মিক পুত্র। এবং তিনি পাক-রুহের কথা বলেছেন, যা হল মাবুদ আল্লাহর পবিত্র-আত্মা।

এই বিষয়ে প্রায়শই আমরা লোকদের কাছ থেকে বিভিন্ন আপত্তিজনক মন্তব্য শুনতে পাই। তাই এই ভিডিওতে আমরা একটি সাধারণ আপত্তির উত্তর দিতে চাই।

অনেকেই প্রশ্ন করেন যে, ঈসা মসীহ্‌ যদি নিজে স্বয়ং মাবুদ আল্লাহ্‌ হন, তাহলে তিনি কিভাবে পিতার কাছে প্রার্থনা করতে পারেন? খুবই ভাল প্রশ্ন, কিন্তু যে কেউ এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে, তার সম্ভবত ট্রিনিটির সম্পর্কে যথেষ্ঠ জ্ঞান নেই।

কিছু জিনিস এক অর্থে একটি বিষয় এবং অন্য অর্থে সম্পূর্ণ আলাদা বিষয় হতে পারে।

উদাহরনস্বরুপ: আমাদের মাথা এবং আমাদের পা দুটিই আমাদের শরীরের অঙ্গবিশেষ; সেই অর্থে তারা এক, কারণ তারা একই শরীরের অংশ। কিন্তু অন্য অর্থে তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন, কারণ তাদের ভিন্ন ভিন্ন কাজ এবং ভূমিকা রয়েছে।

একইভাবে সৃষ্টিকর্তা পিতা, তাঁর কালাম এবং তাঁর  রুহু একটি সুনির্দিষ্ট অর্থে এক। তারা সকলেই একই ঐশ্বরিক স্বত্বা বহন করে, কিন্তু তারা অন্য অর্থে ভিন্ন। তাদের প্রত্যেকেরই আলাদা আলাদা ভূমিকা আছে এবং তারা একে অপরের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন।

এই ধারণাটি বুঝার জন্য আমরা আরো অনেক উদাহরণ ব্যবহার করতে পারি।

যেমন সূর্য একটি উদাহরণ। এটি দূর আকাশের একটি তারকা। সূর্য থেকে আমরা আলো পাই, আবার সূর্য থেকে আমরা তাপও পাই। এখন প্রশ্ন হল: তাপ ও আলো ছাড়া কি সূর্য হয়? অথবা সূর্য থেকে শুধু তাপ আসবে কিন্তু আলো নয়, তা কি সম্ভব? অন্যদিকে, সূর্য, তাপ ও আলো কি একই বিষয়? খেয়াল করুন, সূর্য, তাপ ও আলোর প্রত্যেকেরই নিজস্বতা রয়েছে, কিন্তু প্রত্যেকটিই একে অন্যের সঙ্গে ওতোপ্রতোভাবে জড়িত। অর্থাৎ তার এক হলেও ভিন্ন এবং ভিন্ন হলেও এক।

একইভাবে, মাবুদ আল্লাহ্‌ এক। কিন্তু ২,০০০ বছরেরও বেশি আগে তিনি তাঁর কালাম, ঈসা মসীহ্‌কে পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলেন, যাতে ঈসা মসীহের মাধ্যমে আমরা মাবুদ আল্লাহ্‌কে আরও ভালোভাবে জানতে ও বুঝতে পারি। সেই সাথে সাথে মাবুদ আল্লাহ্‌ তাঁর পাক রুহুকে আমাদের জন্য দিয়েছেন, যিনি ঈমানদারদের মধ্যে বাস করেন এবং তাদের পরিচালনা দেন।

আসুন আরেকটি উদাহরণ দেখি: যদি একটি পাত্রে তরল পানি, বরফ এবং বাষ্প থাকে, আমরা বলতে পারি যে পাত্রে শুধুমাত্র একটি স্বত্বা আছে, H2O, কিন্তু একই সময়ে তিনটি ভিন্ন রুপে। একইভাবে মাবুদ এক স্বত্বা, কিন্তু একই সময়ে পিতা, পুত্র এবং পাক রুহু হিসাবে নিজেকে প্রকাশ করেন।

এখানে বলে রাখা ভাল যে, যদিও এক অর্থে এই উদাহরণগুলি আমাদের মাবুদ আল্লাহ্‌কে বুঝতে সাহায্য করে, অন্য অর্থে সেগুলি সঠিক উপস্থাপনা নয়, কারণ মাবুদ আল্লাহ্‌ অন্য যে কোনও কিছুর চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা, এবং তিনি আমাদের বোঝার ক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি জটিল।

তবে মাবুদ আল্লাহ্‌কে বোঝার জন্য এটি ছিল আমাদের ছোট একটি প্রচেষ্টা মাত্র, কারণ আমরা তাঁকে কখনোই সম্পূর্ণরূপে বুঝতে পারব না।

আপনি যদি মাবুদ আল্লাহ্‌ সম্পর্কে আরও জানতে চান তাহলে আমরা আপনাকে ইঞ্জিল শরিফ পড়তে উৎসাহিত করি।

আপনার কোন প্রশ্ন বা মন্তব্য থাকলে আমরা শুনতে চাই! চ্যাটে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন। আল্লাহ্‌র রহমত আপনার প্রতি বর্ষিত হোক। আমিন।

আরো সাধারণ প্রশ্নগুলি
পেজটি অন্যদের সাথে শেয়ার করুন: